সিনেমা নয়, চলচ্চিত্রে বাড়ছে পরিচালক সংখ্যা

রাহাত সাইফুল, আমার ক্যাম্পাস: চলচ্চিত্রকে সমাজের দর্পণ বলা হয়। সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিজের মধ্যে ধারণ করে নির্মাতা নির্মাণ করেন একটি পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র। আর চলচ্চিত্রে একজন নির্মাতাই সব, তাই তাকে বলা হয় ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ।

এদেশে আবদুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, এহতেশাম, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, সুভাষ দত্ত, শিবলি সাদিকের মত নির্মাতার জন্ম হয়েছে। যতদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র থাকবে ততদিন তাদের নাম শ্রদ্ধাভরে ম্মরণ করবেন এদেশের মানুষ।

এ ছাড়া গাজী মাজহারুল আনোয়ার, আমজাদ হোসেন, দিলীপ বিশ্বাস, চাষী নজরুল ইসলাম, আজিজুর রহমান, মতিন রহমান, শহিদুল ইসলাম খোকন, হুমায়ূন আহমেদ, তারেক মাসুদ‎, তানভীর মোকাম্মেল, দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর মত নির্মাতারা ঢাকাই চলচ্চিত্রে উপহার দিয়েছেন দর্শক নন্দিত চলচ্চিত্র। গুণী নির্মাতাদের তালিকায় আরো রয়েছেন কাজী হায়াৎ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, এফ আই মানিক, সোহানুর রহমান সোহানসহ অনেকে।

নামের সঙ্গে নির্মাতা কথাটি লিখতে গিয়ে তাদের পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠখড়। রাতারাতি নির্মাতার তকমা পেয়ে যাননি তারা। গুণী নির্মাতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন তারা। এমনও হয়েছে বিনা বেতনে দিনের পর দিন কাজ করতে হয়েছে তাদের । এ ছাড়া চলচ্চিত্রকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পরে তারা তাদের আসনে বসতে পেরেছেন। হয়েছেন তারা দর্শক নন্দিত নির্মাতা।

এসব নির্মাতার নাম শুনেই দর্শক হলে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। অথচ এদের অনেকে এখন তাদের ভাবনা, দর্শন অনুযায়ী সিনেমার কাজ না পাওয়ার কারণে নির্মাণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। কর্মহীন দিনাযাপন করায় অনেকে অর্থ কষ্টেও ভুগছেন। আক্ষেপের বিষয় হলো, গত কয়েক বছরে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসা তরুণদের মধ্যে এমন কারও আর্বিভাব হয়নি যাকে গুণী ওই নির্মাতের উত্তরসুরী হিসিবে বিবেচনা করা যাবে।

শিপ বা জাহাজ পরিচালনা করার জন্য ক্যাপ্টেন প্রয়োজন হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেনের জন্য হয়তো কেউ জাহাজ নির্মাণ করবেন না। ঢাকাই চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি না পেলেও চলচ্চিত্র নির্মাতার তালিকা প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। নতুন এসব নির্মাতার মধ্যে হাতে গোনা কিছু নির্মাতা অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বাকি সব নির্মাতারা শুরুতেই হোচট খেয়েছেন। তবে নির্মাতার তকমা থেকেই গেছে তাদের নামের সঙ্গে।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে এমনও অনেক নির্মাতা রয়েছে জীবনে একটিমাত্র সিনেমা নির্মাণ করেই বছরের পর বছর নির্মাতার সদস্য পদ নিয়ে বসে আছেন। প্রতি নির্বাচনে তিনি ভোটও দেন। বাংলাদেশ পরিচালক সমিতির নিয়ম-শৃখলা ভঙ্গ করলে সদস্য পদ বাতিল হবে এবং এটি খুব জোড়ালোভাবে অনুসর করা হয়।কিন্তু সিনেমার মান খারাপ হলে অথবা দীর্ঘদিন সিনেমা নির্মাণ না করলে সদস্য পদ বাতিল হবে এমন কোনো নিয়ম বা শর্ত এই সমিতিতে নেই।

এদিকে গুণী নির্মাতাসহ অনেকে অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত নিমার্তারা কাজ থেকে যেন বাধ্যতামূলক অবসর নিয়েছেন। তাদের হাতে কোনো সিনেমা নেই। এদেরকে বেকার না বলে অবসর বলাটাই ঝুঁকিমুক্ত। এদের জন্য বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্যাপটেন আছেন শিপ নেই!

২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চার বছরে ঢাকাই চলচ্চিত্রে মোট ২৫৪টি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। আর এ ২৫৪টি সিনেমার মধ্যে ব্যবসা সফল হয়েছে মাত্র ১৭টি। বাকি সব সিনেমা ফ্লপ হয়েছে। আর এ চার বছরে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আগমন ঘটেছে ৯৭ জনের অর্থাৎ নিজের নামের আগে নতুন করে চলচ্চিত্র নির্মাতার তকমা লাগিয়েছেন ৯৭ জন। এদের মধ্যে হাতে গোনা দু-একজন ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির জীবিত সদস্য ছিলো মোট ২৭৫ জন। আর গত চার বছরে সদস্য পদ পেয়েছেন ৯৭ জন। চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে এখন মোট সদস্য সংখ্যা ৩৭২ জন। মাত্র চার বছরে ৯৭ জন নতুন নির্মাতার আর্বিভাব যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। অতীতে সিনেমা নির্মাণ হয়েছে বেশি আর নির্মাতার আর্বিভাব হয়েছে কম। আর এখন সিনেমা নির্মাণের তালিকা কমেছে আর নির্মাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নতুন নির্মাতারা তাদের নির্মাণ শৈলির প্রমাণ না দিতে পেরে একটার পর একটা ফ্লপ সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিয়ে আসছে। যার ফলে দর্শক দেশীয় সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ধীরে ধীরে। এতে করে অর্থ লগ্নীকারী প্রযোজক নতুন করে সিনেমায় অর্থ লগ্নী করতে চান না। ফলে দিনে দিনে চলচ্চিত্রের অবস্থা মন্দা হয়ে পড়ছে। আর এই সুযোগেই ভিনদেশীয় নির্মাতা ও কলাকুশলীরা এদেশের সিনেমায় ঢুকে পড়ছেন। সঙ্গত কারণে ঢাকাই চলচ্চিত্রের নির্মাতারা সিনেমা শূন্য হয়ে পড়ছেন।

একটা সময় প্রযোজক সিনেমায় অর্থ লগ্নী করার জন্য পরিচালকদের দারস্থ হতেন। আর এখন উল্টো গিয়ে পরিচালক প্রযোজকের দারস্থ হন। এর কারণ হিসেবে নির্মাতাদের অদক্ষার কথা বলাই যেতে পারে। এ ছাড়া ইদানীং অধিকাংশ সিনেমার প্রযোজক নিয়ে আসেন সিনেমার নায়িকা। আবার অনেক সময় এসব নায়িকা নিজেদের প্রযোজক বলেও দাবি করেন। মূল প্রযোজক আড়ালেই থাকেন। অনেক নির্মাতারা নামের সঙ্গে শুধুই চলচ্চিত্র নির্মাতা তকমা লাগিয়ে খ্যান্ত। তাদেরকে বেকার বলতে ব্যক্তিগতভাবে আমার দ্বিধা নেই। তাছাড়া সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা চলচ্চিত্রের ইমেজকে তলানীতে নিয়ে এসেছে।

চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সদস্য পদ পেতে বড় অংকের একটা ফিও দিতে হয় নতুন পরিচালকদের। তাহলে কি বলবো সমিতির ফান্ড গঠনের জন্য পরিচালক সমিতির সদস্য বৃদ্ধি করা! আর যদি যোগ্যতার বলেই পরিচালক সমিতির সদস্য পদ পেতেন তাহলে গত ৪ বছরের হিট সিনেমার তালিকা এত সংক্ষিপ্ত কেন? এ সব হিট সিনেমার অধিকাংশই আবার পুরোনো নির্মাতাদের নির্মাণ।

সুপার হিট সিনেমার তালিকা লম্বা হলে স্বাভাবিক ভাবে দর্শক হল মুখি হতেন। প্রযোজক ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নী করতেন। আর নির্মাতাদের বেকার বসে থাকতে হতো না। চলচ্চিত্র পাড়া আবারো নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের পদচারণায় মুখরিত হত।

আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে একজন পরিচালককে নামে মাত্র ক্যাপ্টেন হিসেবে রাখা হয়। নির্মাতারা ক্রমাগত প্রযোজক বা সুপার স্টারদের দারস্থ হতে হতে এখন তাদের ইমেজ যেন তলানীতে ঠেকেছে।ব্যক্তিগত কাজে নিজেদের পরিচালক বলে পরিচয় দেওয়ার জন্য তারা ‘পরিচালক’ তকমাটি গ্রহণ করছেন। আর এভাবেই এ দেশের চলচ্চিত্র পরিচালক নামক যে সত্তাটি রয়েছে তার মৃত প্রায় অবয়ব কোনোরকম টিকে আছে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

লেখক : বিনোদন সাংবাদিক

image missing image missing